উদ্ভাস:জীবন পাল্টে দেয়া শিক্ষাদানের প্রয়াস

উদ্ভাস:জীবন পাল্টে দেয়া শিক্ষাদানের প্রয়াস

উদ্ভাসের পথ চলা শুরু হয়েছিল তীব্র আকাঙ্খা থেকে। এ হলো পার্থক্য গড়ার আকাঙ্খা। ‘অন্যরকম মানুষ’ গড়ার আন্দোলনের মাধ্যমে সমাজে পরিবর্তনের সূচনা করার আকাঙ্খা। ২০০০ সালের শেষের দিকে যখন এই আন্দোলনের সূচনা হয় তখন এর উদ্যোক্তারা ভাবতেই পারেননি যে এটি একসময় একটি স্বতন্ত্র রূপ ধারণ করবে। আঠারো বছর পরে আজ ‘উদ্ভাস’ একটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান। সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ‘উদ্ভাস’ ভিন্নতর, ‘উদ্ভাস’ সম্পূর্ণ নিজস্ব একটি ধারা।

উদ্ভাসের শুরুটা অবশ্য তেমন জাঁকালো ছিল না। ‘উদ্ভাস শুরু করার জন্য আমরা মাত্র ৬,০০০ টাকা বিনিয়োগ করেছিলাম। মাসিক ৮০০ টাকা ভাড়ায় আমরা একটি ছোট রুম ভাড়া নিয়েছিলাম। আর শিক্ষার্থীদের বসার জন্য কিছু আসবাবপত্র। এভাবেই শুরু আর শুরুর দিনগুলো খুব কষ্টকর আর চ্যালেঞ্জিং ছিল, কারণ আমাদের কাছে পর্যাপ্ত রিসোর্স ছিল না। কিন্তু পড়ানোর প্রতি আমাদের তীব্র আকাঙ্খা থাকায় সেই কঠিন দিনগুলোর বাধা-বিপত্তি উতরানো সম্ভব হয়েছিল’- ফিউচার স্টার্টআপের সাথে সাক্ষাতকারে এমনটি বলেছিলেন উদ্ভাসের  সহ-প্রতিষ্ঠাতা মাহমুদুল হাসান সোহাগ।উদ্ভাস ছাড়াও তিনি ‘অন্যরকম’ গ্রুপের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান।    

উদ্ভাসের শুরুর দিনগুলো মোটেই সহজ ছিল না। প্রতিষ্ঠার আট বছর পরে উদ্ভাস প্রথমবারের মত ব্রেক-ইভেনে পৌঁছায়। এই দীর্ঘ সময়ে উদ্ভাস টিম দিন-রাত কঠোর পরিশ্রম করে গেছে। বেশিরভাগ সময় টিম মেম্বাররা তাদের পাওনা বেতনটুকুও পায় নি সময়মত। এত কিছুর পরও একমাত্র ভালোবাসাই উদ্ভাসকে টিকিয়ে রেখেছিল। তাদের এ ভালোবাসা পড়ানোর প্রতি,শিক্ষাদানের প্রতি, শিক্ষার্থীদের প্রতি। আর ছিল যে উদ্দেশ্যে উদ্ভাসের জন্ম তা অর্জনের দৃঢ় অটল সংকল্প।  

উদ্ভাসের গল্প সম্পর্কে জানার জন্য আমরা মাহমুদুল হাসান সোহাগ ছাড়াও উদ্ভাসের বিভিন্ন বিভাগের টিম মেম্বারদের সাথে আলাপ করেছি। উদ্ভাসের প্রথম দিককার একজন টিম মেম্বার ফারুক ভাই যিনি এখনও উদ্ভাসের সাথেই আছেন। বর্তমানে তিনি উদ্ভাসের সকল শাখার অবকাঠামোগত উন্নয়নের দিকগুলো দেখাশোনা করেন। উদ্ভাসের প্রথম দিকের দিনগুলো সম্পর্কে ফারুক ভাই বলেন,’আমরা প্রায় সারাক্ষণই কাজ করতাম। আমাদের শিক্ষার্থীদের জন্য সর্বোত্তম শিক্ষা এবং সেবা নিশ্চিত করাই ছিল আমাদের একমাত্র প্রায়োরিটি (এখনও তাই)। উদ্ভাসের পরিচালক এবং টিম মেম্বারদের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই, কখনও ছিলও না। আমরা সবসময়ই ভালো ব্যবহার পেয়েছি। বড় কথা হলো,উদ্ভাস টিমের মধ্যে সবসময়ই একটা ‘সেন্স অব ওনারশিপ’ছিল। এমন বহু রাত গেছে,যখন দেয়াল লিখন শেষে আমরা বুয়েটের হলে ফিরেছি, তারপর সোহাগ ভাই,লিটন ভাই তাদের বিছানায় আমাদের ঘুমাতে দিয়ে নিজেরা মেঝেতে শুয়েছে। উনারা শিক্ষার্থীদের,তাদের অভিভাবকদের সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন রকম বিষয়গুলো তো দেখতেনই,তার উপর প্রতিদিন ক্লাসে ঘন্টার পর ঘন্টা পড়াতেন। তাদের এই নিষ্ঠা,ত্যাগ আমাদের মধ্যেও সংক্রামিত হয়েছিল’।

প্রায় উনিশ বছর ধরে উদ্ভাসের এই যে দীর্ঘ যাত্রা,তার পুরোটা জুড়েই উদ্ভাস তার উদ্দেশ্য অর্জনকে সামনে রেখেছে। বলা যায়,উদ্ভাস হলো একটি ‘পারপাস ড্রাইভেন’ প্রতিষ্ঠান। নিজেদের ব্যবসা বা স্বার্থের চেয়ে তারা সবসময় শিক্ষার্থীদের লাভকে সামনে রেখেছে।

উদ্ভাসের শুরুর দিকের আরেকজন টিম মেম্বার আসাদুজ্জামান। তিনি এখন উদ্ভাসের মার্কেটিং দেখাশোনা করেন। ফিউচার স্টার্টআপের সাথে আলাপকালে তিনি বলেছিলেন,’আমরা আমাদের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য অগুণতি ঘন্টা ব্যয় করেছি। এমন না যে আমরা শুধু তাদের একাডেমিক সমস্যার সমাধান করতাম,তাদের ব্যক্তিগত সমস্যাগুলোর সমাধানের জন্যও আমরা সমান প্রচেষ্টা চালাতাম। উদ্ভাস তাদেরকে শিক্ষা সংক্রান্ত সহায়তা,কাউন্সেলিং এবং এই দুইয়ের মাঝের সকল বিষয়েই সাহায্য করেতো। কাজটা মোটেও সহজ ছিল না বরং খুবই সময়সাপেক্ষ এবং কঠিন বিষয় ছিল। এজন্য আমাদের সবাইকে সাধ্যের অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হতো কিন্তু এর বিনিময়ে আমরা তেমন কিছুই পেতাম না। তখন না পেলেও আমরা এই পরিশ্রমের ফল ধীরে ধীরে পেয়েছি। আমাদের ছোট ছোট সাহায্য আমাদের শিক্ষার্থীদের জীবনে বিশাল পার্থক্য গড়তে ভূমিকা রেখেছে। এর ফলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সাথে আমাদের বেশ গভীর এবং তাৎপর্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠতে শুরু করে। এইটুকুতেই আমরা তৃপ্ত ছিলাম। প্রতিষ্ঠান হিসেবে আমরা ক্ষুদ্র ছিলাম বটে, কিন্তু শিক্ষার্থীদের সেবাদানে আমরা খুবই সিনসিয়ার ছিলাম। মূলত এটাই আমাদেরকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করেছে।’

এখন উদ্ভাসের সর্বমোট ৪২ টি শাখা রয়েছে। প্রতি বছর এই শাখাগুলো থেকে হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে শিক্ষাদান করা হয়। শত শত লোকের পার্ট টাইম ও ফুল টাইম কাজের সুযোগও তৈরী হয় এর মাধ্যমে।

বাংলাদেশের শ্যাডো এডুকেশন বা ছায়া শিক্ষাক্ষেত্রে উদ্ভাস নতুন একটি ধারা তৈরী করেছে যা শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে প্রচলিত ধারার চেয়ে ভিন্নতর ও উৎকৃষ্টতর পন্থা গ্রহণের প্রস্তাব করছে। নতুন এই ধারায় শুধুমাত্র ভালো গ্রেড অর্জন নয় বরং শিক্ষার বৃহত্তর উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য মুখস্তবিদ্যার বিপরীতে বুঝে শেখা,প্রতিযোগিতার বিপরীতে পারস্পরিক সহযোগিতা এবং নম্রতা, সততা ও সাহায্যপরায়নতার মত মানবিক গুণগুলোর প্রতি বেশি গুরুত্ব আরোপ করে। এই ধারানুযায়ী শিক্ষা হলো কিভাবে ভালো জীবন যাপন করা যায় এবং অন্য রকম মানুষ হওয়া যায় তার প্রশিক্ষণ।


আঠারো বছরের কঠোর পরিশ্রম, ত্যাগ এবং সাধনার পরে উদ্ভাস আজকের অবস্থানে পৌছাতে পেরেছে। ফিউচার স্টার্টআপ-এর পক্ষ থেকে উদ্ভাসের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মাহমুদুল হাসান সোহাগের কাছে উদ্ভাসের দীর্ঘ যাত্রার পেছনের গল্প জানতে চাওয়া হয়েছিল। উত্তরটা তার জবানীতেই তুলে ধরা হলো:

Mahmudul Hasan Sohag
Mahmudul Hasan Sohag

আমার জন্ম এবং বেড়ে উঠা জামালপুরের সরিষাবাড়িতে। আমি সেখানে এসএসসি পর্যন্ত পড়ালেখা করেছি। ছোটবেলা থেকেই আমি বেশ অনুসন্ধানী প্রকৃতির ছিলাম এবং প্রচুর প্রশ্ন করতাম। যে কোন বিষয় সম্পর্কে জানা এবং গভীরে বোঝার ব্যাপারে আমার তীব্র আকাঙ্খা ছিল।

সাধারণতঃ বাংলাদেশের মফস্বলের স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীদেরকে প্রশ্ন করতে এবং এর মাধ্যমে তাদের আগ্রহকে বাড়িয়ে তুলতে উৎসাহিত করা হয় না,তবে আমার স্কুল এ দিক থেকে আলাদা ছিল। আমার শিক্ষকবৃন্দ,বিশেষ করে আমাদের স্কুলের প্রধান শিক্ষক বাবু জ্যোতিষ চন্দ্র সাহা এবং আরেকজন শিক্ষক যার কাছে আমি প্রাইভেট পড়তাম, প্রয়াত চন্দ্র নাথ, সবসময় আমাকে প্রশ্ন করতে উৎসাহ দিতেন। তারা এই ব্যাপারে এতটাই নিষ্ঠাবান ছিলেন যে প্রয়োজনে আমার তৃষ্ণা মিটানোর জন্য অতিরিক্ত সময় বরাদ্দ করতেন। জ্যোতিষ স্যার এমনকি প্রত্যেক সপ্তাহে স্কুলের ছুটির পরে সকল শিক্ষকের সাথে আমার আলাদা সেশনের ব্যবস্থাও করেছিলেন।

আমার এসএসসি রেজাল্টের ব্যাপারে শিক্ষকদের উচ্চাকাঙ্খা ছিল। তারা চেয়েছিলেন আমি এসএসসিতে আমার স্কুলের প্রথম ছাত্র হিসেবে বোর্ড স্ট্যান্ড করি। আমার বাবা-মা এবং শিক্ষকদের এই প্রত্যাশার চাপকে অস্বীকার করা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না,আমি বোর্ড স্ট্যান্ড করতে সক্ষম হয়েছিলাম। এই অভিজ্ঞতা আমার পুরো জীবনকে পাল্টে দিয়েছে।

কলেজে ভর্তি হলাম। অন্যদের কাছ থেকে জানা গেল, এতদিন যে শিক্ষকদের লেখা বই পড়েছি, তারা এই কলেজে ক্লাস নিবেন। যাদের নাম বইয়ের পাতায় দেখেছি তাদের কাছ থেকে সরাসরি লেকচার শুনবো, সরাসরি প্রশ্ন করে উত্তর পাবো – এটা ভেবে তখন খুবই উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু আমার ধারনা ছিল না – কলেজের পরিবেশ আমার স্কুলের মতো নয়।

আমি ক্লাসের শেষে প্রাইভেট ব্যাচে পড়তে যেতাম। কিন্তু সেখানে সময় ছিল কম,আর এই অল্প সময়ে প্রশ্ন করে শিক্ষকদেরকে বিরক্ত করা ছাড়া আর কিছু হতো না। এমন কিছু শিক্ষককেও দেখেছি যারা সাধারণভাবে শিক্ষার্থীদেরকে প্রশ্ন করতে নিরুৎসাহিত করতেন। আর প্রচুর প্রশ্ন করাকে তো নেতিবাচকভাবে দেখা হতো। এই ব্যাপারটা বোঝার মতো বড় ছিলাম না,ফলে এই প্রশ্ন করার জন্য বহুবার বকা খেয়েছি,অপমানিত হয়েছি। শিক্ষকদের এমন আচরণের পেছনে হয়তো যুক্তি ছিল। হয়তো,সময়ের অভাব ও অন্যান্য সমস্যার কারণে তারা শিক্ষার্থীদেরকে প্রশ্ন করতে উৎসাহিত করতেন না। কিন্তু আমার জন্য এই অভিজ্ঞতা খুবই হতাশাজনক ছিল। ফলে, আমি পড়াশোনায় অমনোযোগী হয়ে পড়ি। এ কারণে আমার ফার্স্ট ইয়ারে পড়াশোনা এবং ফলাফলে ভালো প্রভাব পড়েছিল।

যাহোক,পরের বছরেই আমি ঘুরে দাঁড়াই এবং পড়াশোনায় মনযোগ দেই এবং আমার ঘাটতিগুলো পুষিয়ে নিতে পারি। আমার প্রতি অন্যদের প্রত্যাশা থেকে আমি বেশ অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম। অনেক সময় অন্যদের ইতিবাচক প্রত্যাশা মোটিভেশন হিসেবে কাজ করে। বিশেষ করে আমার হোমটাউনের লোকজন আমার সম্পর্কে বেশ উঁচু ধারনা পোষন করতো। কলেজ জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণেই সম্ভবতঃ, আমি প্রতিজ্ঞা করলাম – এমন একটি প্রতিষ্ঠান বানাবো যেখানে শিক্ষার্থীদেরকে প্রশ্ন করতে,তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক তৃষ্ণা মেটানোর জন্য উৎসাহিত করা হবে। আমি মনে করি, যে প্রশ্ন করে সে চিন্তা করে, যে প্রশ্ন করে না সে জানে না কিভাবে চিন্তা করতে হয়। আর চিন্তা করতে শেখা হলো জীবনে প্রয়োজনীয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতাগুলোর একটি।

কলেজে বাকী সময়ের পুরোটা জুড়েই আমি কঠোর পরিশ্রম করলাম। বিশেষ করে,আমার মনে পড়ে,রমজান মাসে আমি আক্ষরিক অর্থেই জেগে থাকা প্রতিটি মুহুর্তকে কাজে লাগিয়েছিলাম। এখন আমার নিজেরই বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়,আমি সে সময় এতটা পরিশ্রম করেছিলাম। এই পরিশ্রমের সন্তোষজনক ফল পাওয়া গেল। এইচএসসি পরীক্ষায় আমি ঢাকা বোর্ডে চতুর্থ স্থান অধিকার করলাম। এটা আমার এসএসসি রেজাল্টের চেয়েও ভালো ছিল।

রেজাল্টের পরপরই আমি বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করি। যদিও সবার ধারনা ছিল যে আমি মেধাতালিকার প্রথম দিকে থাকবো,আমি অতটা ভালো করতে পারিনি,তবে খুব খারাপও করিনি। বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষায় আমি ১৪১তম হই। আগের রেজাল্ট যাই হোক না কেন ভালো করতে হলে প্রতিদিনই কঠোর পরিশ্রম করতে হবে – তখন আমার এই বোধোদয় হলো।

মানুষকে বোঝানোর ব্যাপারে আমার সবসময়ই বেশ আগ্রহ ছিল। কলেজে পড়াকালীন সময়ে আমি আমার ক্লাসমেট এবং বন্ধুদেরকে পড়াশোনার ব্যাপারে সাহায্য করতাম। তারা এটা পছন্দ করতো,আমারও ভালো লাগতো। আমি বুঝতে পারলাম যে আমি শিক্ষকতা পছন্দ করি। ফলে অবচেতনভাবেই ‘উদ্ভাস’ শুরু করার মোটিভেশন ছিল।

২০০০ সালের নভেম্বরের মধ্যে আমার বুয়েটে ভর্তির সকল কাজ শেষ হয়ে গেল। হামিদ এবং আরও কিছু বন্ধুর সাথে আমি হোস্টেলে থাকতাম। সে বছর বুয়েটে প্রায় পুরো বছর জুড়েই সেশন জট ছিল। ফলে,আমাদের হাতে যথেষ্ট সময় ছিল। ২০০০ সালের ডিসেম্বর মাসে আমি আর হামিদ মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম -স্টুডেন্ট পড়াবো। আর এভাবেই উদ্ভাসের শুরু।

আমার কাছে টিউশনি আর অন্যান্য জায়গা থেকে পাওয়া ৬,০০০ টাকা ছিল,সেটাই উদ্ভাসে বিনিয়োগ করলাম। হামিদও একই পরিমান বিনিয়োগ করলো। মোহাম্মদপুরে মাসে ৮০০ টাকা ভাড়ায় আমরা ছোট্ট একটা রুম ভাড়া নিলাম। ব্যাস,শুরু হলো। শুরুর দিকের দিনগুলোতে আমাদের হাতে যথেষ্ট রিসোর্স না থাকলেও আমার এবং হামিদের দুজনেরই পড়ানোর ব্যাপারে প্রচন্ড আগ্রহ ছিল।

ভাড়ায় নেয়া রুমে তিনটি বেঞ্চ বসালাম। প্রচারের জন্য কিছু লিফলেট তৈরি করে বিভিন্ন স্কুলে বিতরণ করলাম। তারপর মানুষের দৃষ্টি আকর্ষনের জন্য বিখ্যাত ব্যক্তিদের কোটেশন দিয়ে দেয়াল লিখন করলাম। প্রথম ব্যাচে তিনজন ছাত্র ভর্তি হলো। ওরা কোন পেমেন্ট করেছিল কিনা মনে করতে পারছি না।

তখন আমাদের ফি ছিল ৭০০ টাকা। অন্যান্য কোচিং সেন্টারের তুলনায় এই ফি কিছুটা বেশি ছিল। কোচিং সেন্টারগুলো যে সাধারণত ২০০-৩০০ টাকা ফি নেয় সেটা আমরা জানতাম না। এই বিষয়টা আমরা অনেক পরে জেনেছি। আসলে কোচিং সেন্টার সম্বন্ধে আমাদের কোন জ্ঞানই ছিল না।

তখন আমি ওমেকা কোচিং সেন্টারে ক্লাস নিতাম। ওমেকার পরিচালকের সাথে আমার ভালো সম্পর্ক ছিল। তিনি জানতেন যে আমরা উদ্ভাস নিয়ে চেষ্টা চালাচ্ছি। একদিন তিনি বললেন যে ওমেকা-তে কিছু রুম রয়েছে আমরা চাইলে উদ্ভাসের জন্য সেগুলো ব্যবহার করতে পারি। যেহেতু আমাদেরটা একাডেমিক কোচিং ছিল,তাই সম্ভবত আমাদের সহায়তায় তিনি ওমেকার নাম ছড়ানোর সুযোগ দেখতে পেয়েছিলেন।

তার এই প্রস্তাবের কারণে এক বছর বাদে আমরা মোহাম্মদপুর থেকে ধানমণ্ডিতে ওমেকা  কোচিং সেন্টারের একটি রুমে চলে এলাম। সে সময় যদিও আমাদের হাতে গোনা কিছু শিক্ষার্থী ছিল, শিক্ষক নিয়োগ করে পড়ানোর মতো অবস্থায় আমরা ছিলাম না। তো, আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম – একজন পার্টনার নিবো। পার্টনার হিসেবে যাদেরকে আমাদের পছন্দ ছিল তাদের একজন লিটন। ও হলে থাকতো এবং হল কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে হলেই ২০-৩০ জন ছাত্র পড়াতো। একদিন বিকেলে আমরা লিটনকে ‘উদ্ভাস’ এর পার্টনার হিসেবে  যোগ দিতে আগ্রহী কিনা জিজ্ঞেস করলাম। লিটনের সাথে যখন কথা বলছিলাম তখন তার বন্ধু মাজেদও সেখানে ছিল। শেষ পর্যন্ত লিটন আর মাজেদ দুজনই আমাদের সাথে পার্টনার হিসেবে যোগ দিল। এতে পার্টনার ছাড়াও আমাদের যে লাভ হলো – আমরা বিজ্ঞানের চারটি বিষয়ের প্রত্যেকটি পড়ানোর জন্য একজন করে শিক্ষক পেলাম। অবশ্য, ব্যক্তিগত কারণে হামিদ  সে বছরই ‘উদ্ভাস’  ছেড়ে দিল এবং তার জায়গায় পার্টনার হিসেবে আমাদের বুয়েটের একজন ক্লাসমেট পাভেলকে নিলাম। এভাবে ২০০৬ পর্যন্ত চলল।

ধানমন্ডি আমাদের জন্য আইসোলেটেড লোকেশন ছিল। ফার্মগেটের আশেপাশে পড়তে চাইতো এমন বিরাট সংখ্যক শিক্ষার্থীকে আমরা হারাচ্ছিলাম। সুতরাং,আমরা ফার্মগেটে চলে আসার সিদ্ধান্ত নেই এবং ২০০২ সালে তেঁজকুনি পাড়ায় একটি রুম ভাড়া নিয়ে ফার্মগেটে চলে আসি। এবার আমাদের সত্যিকারের সংগ্রাম শুরু হলো। আমাদের খুব বেশি সংখ্যক শিক্ষার্থী ছিল না ফলে সবসময়ই ওয়ার্কিং ক্যাপিটালের অভাব লেগেই থাকতো। তার উপর,বাজেট সংকটের কারণে আমাদের কোন একাউন্টেন্ট ছিল না বলে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আমরা যথাযথভাবে টাকা পয়সা পাচ্ছি কিনা সে ধারণাও ছিল না। আমাদের একমাত্র টিম মেম্বার ছিলেন ফারুক ভাই যিনি সে সময় বুয়েটে ক্যান্টিন বয় হিসেবে কাজ করতেন। তিনি তখন থেকেই আমাদের সাথে আছেন। এখন তিনি আমাদের নতুন শাখাগুলোর অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয়গুলো দেখাশোনা করেন।

শুরুর দিনগুলোতে আমরা উদ্ভাসের সাসটেইনেবিলিটি নিশ্চিত করার জন্য এমন কোন কাজ নেই যা করিনি। আমরা একজন কম্পিউটার অপারেটর নিয়োগ দিয়ে আমাদের সাথে বুয়েটের হলে থাকার প্রস্তাব করলাম। তার অল্প বেতন সত্ত্বেও সে যেন আমাদের সাথে থেকে যায় – এটাই ছিল উদ্দেশ্য। আমরা পর্যায়ক্রমে আমাদের বিছানা শেয়ার করতাম।

কিছুদিন পরে আমরা নটর ডেম কলেজের কাছে মতিঝিলে একটি শাখা খোলার উদ্যোগ নিলাম। কয়েকটা বিল্ডিং ঘুরে আমরা একটি পছন্দ করলাম। আমাদের ধারনা ছিল আমাদের পছন্দ করা বিল্ডিংটির ভাড়া মাসে ১০ হাজার টাকার কম হবে না। এই ভাড়া আমাদের ক্যাপাসিটির তুলনায় অনেক বেশি এবং আওতার বাহিরে। তা সত্ত্বেও আমরা বিল্ডিং এর মালিক ইয়েমিন ভাইয়ের সাথে দেখা করতে গেলাম।  আমাদের গল্প শুনে তিনি ভিন্ন ধরনের প্রস্তাব করলেন। তিনি আমাদের অর্ধেক জায়গা ব্যবহার করতে এবং সে অনুযায়ী ভাড়া পরিশোধের পরামর্শ দিলেন। আমার ভুল না হলে,ভাড়ার পরিমান ছিল ৬ হাজার টাকা। এটুকুও আমাদের জন্য কষ্টদায়ক ছিল। কিন্তু ইয়েমিন ভাই আমাদের উৎসাহ দিয়ে বললেন যে আমরা এটা সামলিয়ে নিতে পারবো এবং বাকিটুকুর ব্যবস্থা তিনি করবেন। সেই তখন থেকে শুরু করে আজও তিনি আমাদের প্রচুর সহযোগিতা করেছেন।

অনেক চিন্তা-ভাবনার পর আমরা এই প্রস্তাবে রাজী হলাম। তখন ২০০৫ সাল এবং আমরা উদ্ভাসের গ্রোথ ফিল করতে পারছিলাম। ততদিনে আমরা নটর ডেম কলেজের কিছু আগ্রহী শিক্ষার্থীকে আকৃষ্ট করতে পেরেছিলাম। তারা আমাদের নাম ছড়িয়ে দিয়েছিল,ফলে আমরা আমাদের এই নড়বড়ে প্রতিষ্ঠানে অনেকগুলো নতুন মুখ পেলাম। ছিক্ষার্থীদের অভিভাবকরাও আমাদের প্রচারে বেশ ভূমিকা রেখেছিলেন। ধীরে ধীরে আমরা শুধুমাত্র এই ওয়ার্ড অব মাউথ-এর কারণেই একের পর এক শিক্ষার্থী পেতে থাকলাম।

যাহোক,আমাদের সংগ্রাম কিন্তু তখনও শেষ হয় নি। যেমন,এমনও সময় গেছে যখন আমাদের ৮ মাসের ভাড়া বাকী পড়ে গিয়েছিল। তা সত্ত্বেও,ইয়েমিন ভাই আমাদের প্রতি খুব সদয় ছিলেন এবং ভাড়াকৃত জায়গা ছেড়ে দেয়ার জন্য কখনও বলেন নি। তিনি আমাদেরকে অত্যাধিক পছন্দ করতেন এবং সে সময় প্রচন্ডরকম সহায়তা করেছিলেন। আমাদের উচ্ছেদ করার বদলে তিনি বরং আমাদেরকে ১ লক্ষ টাকা ধার দিয়েছিলেন। আমরা উনাকে পার্টনারশিপের প্রস্তাব দিলাম। তখন পার্টনারশিপের ব্যাপারে আমরা বেশ উদার ছিলাম। তিনি নাকচ করে না দিয়ে বললেন পরে জানাবেন। আমরা বুঝতে পেরেছিলাম যে তিনি উদ্ভাসের ব্যাপারে আগ্রহী।

ইয়ামিন ভাই আরও নানা উপায়ে আমাদের সহায়তা করেছিলেন। আমাদের তখন কোন একাউন্ট্যান্ট ছিল না। স্টুডেন্টদের কাছ থেকে টাকা পয়সা আদায়ের বেলায়ও আমরা নিয়মিত ছিলাম না। আমরা টিউশন ফি চাইতাম না বলে অনেক ছাত্র মাসের পর মাস টাকা দিত না। ইয়ামিন ভাই বুঝতে পেরেছিলেন যে একাউন্ট্যান্টের অভাবে আমরা সঠিকভাবে টিউশন ফি আদায় করতে পারছি না,তাই তিনি একজন একাউন্ট্যান্ট দিয়ে আমাদের সহায়তা করেছিলেন। একাউন্ট্যান্ট হিসাব করে বের করলেন যে এমন কিছু ছাত্রও আছে যারা কয়েকমাস ধরে পড়ছে কিন্তু এক পয়সাও দেয় নি। তিনি আমাদের সাথে কিছুদিন কাজ করে এই সমস্যা ঠিক করে দিলেন। পরে অবশ্য ইয়ামিন ভাই পার্টনারশিপের ব্যাপারে তেমন আগ্রহ দেখান নি বরং আমাদেরকে বললেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তার ঋণ শোধ করে দিতে। সম্ভবত তিনি তার একাউন্ট্যান্টের কাছ থেকে রিপোর্ট পেয়ে ভেবেছিলেন আমরা হোপলেস কেস!

আমরা ধীরে ধীরে গ্রো করছিলাম। স্টুডেন্টের সংখ্যা উঠানামা করতো কারণ বেশিরভাগ ছাত্রই নোট এবং সাজেশন চাইতো। কিন্তু উদ্ভাসে এগুলো কঠিনভাবে নিষিদ্ধ ছিল। আমাদের প্রধান চাওয়া ছিল শিক্ষার্থীরা যা পড়ছে তা যেন বুঝতে পারে। অভিভাবকরাও বিচলিত হতো যখন আমরা বলতাম যে আমরা কোন নোট বা সাজেশন দেই না। সত্যি কথা হলো,শুরুর দিনগুলোতে আমাদের ছাত্র পেতে বেশ কষ্ট হচ্ছিল কারণ অভিভাবকরা আমাদের কাছে এসে জানতে চাইতেন আমরা কি কি সেবা দিবো,আমরা হ্যান্ড নোট বা সাজেশন দিবো কি না ইত্যাদি। উত্তরে আমরা বলতাম যে আমরা এ সব দিবো না। তাদের করা প্রশ্নের উত্তরের উপর নির্ভর করে তারা সিদ্ধান্ত নিতেন তাদের সন্তানকে কোথায় পড়াবেন। কিন্তু অল্প কিছু মানুষ ছিলেন যারা এ ধরনের উত্তরই খুঁজতেন। কোন কিছু না বুঝে মুখস্ত করাকে আমরা সবসময় নিরুৎসাহিত করি। যাহোক,আমরা এই নীতিতে অটল ছিলাম এবং এর ফলও পাওয়া গেল।

আমাদের প্রথম বড় ধরণের সাফল্য এলো ২০০৫-এ। এইচএসসি’০৫ ব্যাচের কিছু শিক্ষার্থী উদ্ভাসের সত্যিকারের ভক্ত ছিল। তারা আমাদের ব্রান্ড এম্বাসেডর হিসেবে কাজ করে এবং আমাদের নাম ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করে৷ এর ফলে আমরা অনেক নতুন ছাত্র পাই। তারপর এইচএসসি’০৮ ব্যাচ ছিল আমাদের বিশাল সাফল্য। আমরা ভালো সংখ্যক শিক্ষার্থীকে আকৃষ্ট করতে পারলাম। এক পর্যায়ে আমরা এতটাই জনপ্রিয় হয়ে গেলাম যে বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদেরকে আমাদের কাছে না আসার জন্য জোর প্রচেষ্টা চালাতে শুরু করলো। এটা কিছু সময়ের জন্য চ্যালেঞ্জিং হলেও আখেরে আমাদের ক্ষতির চেয়ে উপকারই বেশি হলো। যেসব ছাত্র আমাদের সম্পর্কে জানতো না তারা তাদের শিক্ষকদের থেকেই আমাদের কাজ সম্পর্কে বেশি জানতে পারলো।

সে সময় আমাদের একদল দুর্দান্ত শিক্ষক ছিল যারা টাকার জন্য নয় বরং পড়ানোর প্রতি ভালোবাসা থেকে আমাদের সাথে ছিল।আমাদের এই অবস্থানের পিছনে তাদের অবদান অনেক। আজও,উদ্ভাসকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে এর শিক্ষকগণ। আমরা সবচেয়ে ভালো শিক্ষকদেরকে নিয়োগ দেই এবং তারা যেন তাদের ছাত্রদেরকে সর্বোচ্চ দিতে পারে তা নিশ্চিত করার জন্য সকল প্রকার সহায়তা দেই।

প্রথমদিকের দিনগুলোতে আমরা আমাদের ছাত্রদের জন্য প্রচুর রিসোর্স বিনিয়োগ করেছি। শুধু পড়াশোনার জন্যই না,এর বাইরেও সাহায্য করেছি। আমরা তাদের ব্যক্তিগত সমস্যার কথা শুনতাম,সমাধানে সাহায্য করতাম। আমরা তাদের বাবা-মা’র কাছের মানুষ হয়ে গিয়েছিলাম। এমন ঘটনাও আছে যেখানে আমরা একপ্রকার তাদের পরিবারের সদস্য হয়ে গিয়েছিলাম। মোটকথা,আমরা আমাদের ছাত্রদেরকে ক্লাসে এবং ক্লাসের বাইরে প্রচুর সময় দিয়েছি।

শুরুর পাঁচ বছর পরে যখন উদ্ভাস আরও অনেক বেশি চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন তখন আমাদের দুইজন পার্টনার পার্টনারশিপ থেকে বেরিয়ে কেবল শিক্ষক হিসেবে সাথে থাকার সিদ্ধান্ত নিল। এটা তাদের দিক থেকে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত ছিল। আমরা তখন বুয়েট থেকে গ্রাজুয়েশন শেষ করার পথে এবং উদ্ভাস শীঘ্রই একটি ভালো অবস্থানে পৌঁছাবে তার কোন চিহ্ন দেখা যাচ্ছিল না। বাস্তবতার ডাকে তাদেরকে সাড়া দিতে হলো। আমি আর লিটন হাল ছাড়লাম না,আমরা এর শেষ দেখার ব্যাপারে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলাম। এটা কোন যৌক্তিক সিদ্ধান্ত ছিল না। আর আমরা যদি টাকার দিকে তাকিয়ে থাকতাম তাহলে কখনও এতদূর আসতেও পারতাম না। ঠিক এই কারণেই আমি সবসময় বলি,শুধু টাকা তৈরির খেলায় মত্ত থাকলে টেকসই প্রতিষ্ঠান তৈরি করা সম্ভব না। সে সময়ে টাকা পয়সা বা অন্য বিচারে উদ্ভাসের জন্য খেটে যাওয়ার কোন যুক্তি ছিল না। কিন্তু আমরা এ ব্যাপারে মোটেও উদ্বিগ্ন ছিলাম না।

আমাদের প্যাশন ছিল এমন একটি এডুকেশনাল প্রতিষ্ঠান তৈরি করা যেটি প্রকৃতপক্ষেই ছাত্রদের যত্ন নিবে। ধন সম্পদ তৈরি বা অন্য ক্যারিয়ার বেছে নেয়ার চেয়ে অন্যরকম মানুষ তৈরীর জন্য আমাদের আগ্রহ অনেক বেশী জোড়ালো ছিল। আমাদেরকে সবসময় যে ব্যাপারটি মোটিভেটেড রেখেছিল তা হলো আমাদের ছাত্রদের মধ্যকার পরিবর্তন,সেটা যত ছোটই হোক না কেন।

বর্তমানে ‘অন্যরকম’ গ্রুপের অন্যতম ফোকাস হলো শিক্ষা। ‘উদ্ভাস’ হলো সবার প্রথম পদক্ষেপ যার সাথে পরে ‘উন্মেষ’ যুক্ত হয়েছে। এগুলোকে আমরা প্যারালাল স্কুল বা শ্যাডো এডুকেশন সেন্টার হিসেবে গন্য করি।

অনেকে বলতে পারেন যে আমরা কোচিং সেন্টার পরিচালনা করছি। গতানুগতিক দৃষ্টিকোন থেকে এটা মনে করাই স্বাভাবিক। প্রকৃতপক্ষে,আমাদের দেশে কোচিং সেন্টার বলতে যা বোঝায় ‘উদ্ভাস’ এবং ‘উন্মেষ’ তার থেকে ভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠান।

যেমন ধরুন,কোচিং সেন্টার হলো শর্টকাটের সমার্থক। নোট এবং সাজেশনের জন্য প্রচুর শিক্ষার্থী কোচিং সেন্টারে যায়। উদ্ভাসে আমরা হ্যান্ড নোট বা সাজেশন দেই না। আমরা তাদের পড়াই,সঠিকভাবে জানা ও বোঝার জন্য উৎসাহ দেই। আমরা নোট বা সাজেশন দেই না সত্যি, কিন্তু আমরা প্রচুর মডেল টেস্ট নেই এবং খাতা ফেরত দেবার সময় সেখানে আমাদের ফিডব্যাক লিখে দেই।

কোচিং এবং লার্নিং এর মধ্যে বিশাল একটি পার্থক্য রয়েছে যা বেশিরভাগ মানুষই ধরতে পারেন না। লার্নিং মানুষের মধ্যে যোগ্যতা সৃষ্টি করে।

‘উদ্ভাস’ একটি লার্নিং সেন্টার। আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল খুব সাধারণ এক নীতি থেকে – যাই শিখো না কেন, বুঝতে হবে। মুখস্ত করার আগে বুঝতে শেখো। আমরা আমাদের সকল একাডেমিক কার্যক্রমে এই নীতিটি মেনে চলেছি। আপনি যদি আমাদের ক্লাস এইট থেকে কলেজ পর্যন্ত পরিচালিত একাডেমিক কার্যক্রম দেখেন তাহলেই এর সত্যতা বুঝতে পারবেন।

আমাদের শিক্ষার্থীদের সহায়তার উদ্দেশ্যে আমরা প্রচুর কার্যক্রম গ্রহণ করেছি। আমাদের নিজেদের বৃত্তি কর্মসূচি রয়েছে। কোচিং সেন্টারে সাধারণত এটা থাকে না। যখন আমরা প্রথম এটা শুরু করি, তখন আমাদের নির্দিষ্ট কোন প্রসেস ছিল না। যে কেউ আমাদেরকে বোঝাতে পারলেই আমরা সাহায্য করতাম। এখন আমাদের নির্দিষ্ট একটি প্রসেস আছে। যারা সেই সাহায্য গ্রহণ করে তাদের কাছ থেকে আমরা এই প্রতিশ্রুতি নেই যে তারা যখন সক্ষম হবে তখন কমপক্ষে সমপরিমাণ টাকা অন্যকাউকে সাহায্য করবে। বর্তমানে আমাদের সিএসআর ডিপার্টমেন্ট এ সকল শিক্ষার্থীর সাথে যোগাযোগ রাখছে।

২০০৮ সালে আমরা আমাদের ম্যাগাজিন ‘নিরন্তর’ প্রকাশ করি। এ ধরণের এডুকেশনাল ম্যাগাজিন আমরাই প্রথম প্রকাশ করি। উদ্ভাসে আমরা ডিবেট,বিভিন্ন প্রকারের ক্লাব এবং আরও অনেক ধরনের এক্সট্রাকারিকুলার একটিভিটিস চালু করেছি।

আমরা অনেক মজার জিনিসও করি। যেমন,আমরা ওপেন-বুক পরীক্ষা চালু করেছি। দশ বছর আগে যখন প্রথম এটি চালু করি তখন মানুষ হেসেছে। কিন্তু পরে তারা বুঝতে পারে এটি যেমন হাস্যকর মনে হয়েছিল তেমন নয়,কারণ এই পদ্ধতিতে পরীক্ষায় ভালো করতে সব কিছু সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারনা থাকতে হয়।

শিক্ষার্থীরা যা পড়ছে তাতে আরও ভালো করা, তাদের পাঠ ভালোভাবে বোঝা এবং তারপর যোগ্য এবং উন্নত মানুষ হিসেবে গড়তে সহায়তা করা আমাদের অঙ্গীকার। উদ্ভাসের লোগোতে দেখুন,আগুনের চারটি শিখা রয়েছে যা আমাদের অঙ্গীকারকে প্রকাশ করে। এই শিখাগুলো শিক্ষার প্রধান চারটি উদ্দেশ্যের সমার্থক।

আমরা বিশ্বাস করি, শিক্ষা এমন পরিশোধিত মানুষ তৈরীতে ভূমিকা রাখে যে সূক্ষ্ম চিন্তা করতে পারে, যার মধ্যে অধ্যাবসায়,প্রত্যয় এবং সর্বোপরি,নৈতিকতা তৈরী হয়।

আমরা আমাদের শিক্ষার্থীদেরকে তারা যা পড়ছে তা সম্পর্কে চিন্তা করতে সাহায্য করি। আমরা না বুঝে মুখস্ত করতে শেখাই না। আমরা চাই তারা ধৈর্য্য ধরে শিখুক এবং তাৎক্ষনিক তৃপ্তি না পাক। যদি তারা ধৈর্য্য ধরে এবং এজন্য পুরষ্কৃত হয়,তাহলে তাদের মধ্যে প্রত্যয় তৈরী হবে। আমরা বিশ্বাস করি,একজন শিক্ষিত ব্যক্তির নৈতিক মান খুব উঁচু হবে,সে হবে একজন অন্যরকম মানুষ। তার মধ্যে এমন মূল্যবোধ থাকবে যা কেবল তাকে নয়,পুরো সমাজকেই এগিয়ে নিবে। ‘উদ্ভাস’ এবং আমাদের সকল শিক্ষা প্রচেষ্টার লক্ষ্য এটাই।

সত্যি হলো,আমরা নৈতিকতাকে শিক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক বলে মনে করি। বাকীগুলো এর অংশ। শিক্ষার প্রধান দায়িত্ব হলো নৈতিকতাবোধসম্পন্ন মানুষ গড়ে তোলা।

আপনি জিজ্ঞেস করতে পারেন,আমরা কিভাবে নৈতিকতা শিক্ষা দিই। আমরা কি কোন কারিকুলাম অনুসরণ করি? ধর্মীয় বিষয়ে বই লিখেছি? না। এতে খুব একটা উপকার হয় না। আমরা কেবলমাত্র মুখে আমাদের ছাত্রদেরকে নৈতিকতাসম্পন্ন মানুষ হতে বলি না বরং আমরা তাদের দেখাতে চেষ্টা করি কিভাবে নৈতিকতাসম্পন্ন মানুষ হতে হয়। যেমন,আমরা যখন অন্যরকম পাঠশালা শুরু করি,আমরা আমাদের শিক্ষার্থীদেরকে ভিডিও লেকচারগুলো ফ্রি-তে দিয়েছি। দেয়ার সময় আমরা তাদেরকে এই শর্ত দিয়েছি যে তাদেরকে এই লেকচার যত বেশি সম্ভব শিক্ষার্থীর মাঝে বিতরণ করতে হবে। মানুষকে সাহায্য করার জন্য আমরা সবসময় আমাদের ছাত্রদেরকে উৎসাহিত করি। প্রতিযোগিতার চেয়ে আমরা সহযোগিতা করার জন্য আমরা উদ্বুদ্ধ করি,নৈতিকতা ও মানবিকতাকে উৎসাহ দেই।

মানুষ অনুকরণশীল। আমরা দেখে শিখি। তাই আমাদের উত্তম উদাহরণ প্রয়োজন যাকে আমাদের শিক্ষার্থীরা অনুসরণ করতে পারে। এজন্য আমাদের শিক্ষক প্রয়োজন। এমন শিক্ষক যাদেরকে শিক্ষার্থীরা রোল মডেল হিসেবে গ্রহণ করতে পারে। এমন শিক্ষক যাদের নৈতিক মান অনেক উঁচু। এই বিশ্বাস থেকেই আমরা রোল মডেল শিক্ষক খোঁজ করি। উদ্ভাসের শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া খুবই কঠোর। নতুন শিক্ষকদের কনসেপচুয়াল এবং সাইকোলজিক্যাল বিষয়সহ অনেকগুলো ধাপ পেরিয়ে যেতে হয়। আর হ্যাঁ,এ জন্য তাদেরকে আমরা বেশ ভালো পারিশ্রমিকও দেই।

আমাদের সৌভাগ্য,আমরা এমন এক দল শিক্ষক খুঁজে পেতে সক্ষম হয়েছি। তাদের অনেকেই এখানে আয় করতে এসে প্যাশনেট হৃদয় নিয়ে বের হয়েছে। যদিও আমরা অনেক দূর এসেছি, আমরা মনে করি,আমাদের যাত্রা কেবল শুরু হলো।

উদ্ভাসে টাকা উপার্জন করার মোটিভেশন আমাদের কখনই ছিল না। আমরা শুধুমাত্র তাই করি যা আমাদের ছাত্রদের জন্য কল্যাণকর। আমরা সেইসব সহায়তাই দেই যা কেবল তাদের শিক্ষাক্ষেত্রেই নয় জীবনেও কাজে লাগে। উদ্ভাস শিক্ষার্থীদের জন্যই পরিচালিত প্রতিষ্ঠান,আর এ কারণেই উদ্ভাস দেশের অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে আলাদা।

We Recommend

Type to Search

See all results
Shares